সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রাষ্ট্র কী প্লুং বাঁশির বেদনার সুর শুনবে?



তারিখঃ ১১ নভেম্বর ২০২০

২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর সাজেক ভ্যালিতে পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন চট্টগ্রাম ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি সাব্বির আহমেদ। ঘোষণার কিছুদিন পরেই ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদ ৩০ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিয়ে সাজেক ভ্যালি দেখতে গিয়েছিলেন। জানা যায়, মহামান্য রাষ্ট্রপতি লুসাই আদিবাসী অধ্যুষিত রুইলুই পাড়ায় বেশ স্বাচ্ছন্যপূর্ণ ও সুন্দর সময় কাটিয়ে ফিরেছিলেন। সাজেকের সৌন্দর্য তখন থেকে পর্যটকদের কাছে ডানা মেলা শুরু করেছে এবং সাজেক প্রমোটে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে তখন দেশের সব মিডিয়া, সেনাবাহিনী, বিভিন্ন ট্রাবেল গ্রুপ ও উন্নয়নের রাজনীতি করা নেতা-আমলারা। এই পর্যটন প্রমোট ও গড়ে তোলার ফাঁকফোকরে পড়ে কখন যে রুইলুই পাহাড়ে লুসাই ৮৫ পরিবার উচ্ছেদ হয়ে গেলো আমরা কেউ জানতেও পারলাম না। কোনো মিডিয়া, সরকারি কর্মকর্তা ও আমলারা এ বিষয়ে টুঁ শব্দ করেননি, কেউ কিছু বলেননি। সবাই নীরব ছিলেন।

গতমাসে (১৫ অক্টোবর, ২০২০ ) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বান্দরবান সফরে গিয়েছিলেন। তিনি থানচি উপজেলায় বেশ কিছু পর্যটন স্পট ঘুরে দেখেন। এরমধ্যে স্থানীয় ভূমিপুত্র ম্রোদের ৮০০ একরের উপর জায়গা দখল করেছে সেনা কল্যাণ সংস্থা ও সিকদার গ্রুপ। তাঁরা চিম্বুক পাহাড়ের ৭০ থেকে ৮০টি ম্রো পাড়ার ১০,০০০ ম্রো উচ্ছেদের হুমকির মুখে নির্মাণ করছে ৩৫০ কোটি টাকার উপরের বিলাসবহুল হোটেল ম্যারিয়ট ও পর্যটন স্থাপনা।

পর্যটন স্থাপনের ফলে পাহাড়িরা প্রথমভাবে জমি হারাচ্ছে তা কিন্তু নয়। এর আগেও হোটেল-রিসোর্ট, পর্যটন স্থাপনা ও সেনা-বিজিবি ক্যাম্প নির্মাণে পাহাড়িরা জমি হারিয়েছে। জমি হারানোর একটি ছোট্ট চিত্র দেখুন-

১.কাপ্রু ম্রো পাড়া (নীলগিরি)। জমির পরিমাণ ৬০ একর। উচ্ছেদ ২০০ ম্রো ও মারমা পরিবার।

২.চিম্বুক পাহাড় (সুয়ালক, ভাগ্যকুল, টংকাবতী, কদুখোলা)। জমির পরিমাণ ১১,৪৬৮.৪৮ একর। উচ্ছেদ ৭৫০ পরিবার।

৩.রুইলুই পাড়া (সাজেক)। জমির পরিমাণ ৫ একর। উচ্ছেদ ৬৫ পরিবার।

৪. নীলাচল (বান্দরবান)। জমির পরিমাণ ২০ একর। উচ্ছেদ ১০০ পরিবার।

৫. ক্রাউডং/রংরাং পাহাড় (ডিম পাহাড়)। জমির পরিমাণ ৫০০ একর (প্রক্রিয়াধীন)। উচ্ছেদ ২০২ পরিবার।

৬. সেপ্রু পাড়া (জীবননগর)। জমির পরিমাণ ৫০০ একর (প্রক্রিয়াধীন)।

৭. চন্দ্রপাহাড় (বান্দরবান)। জমির পরিমাণ ৫০০ একর (প্রক্রিয়াধীন)। উচ্ছেদ ১২৯ পরিবার।

৮. যত্ন মোহন কার্বারি পাড়া (বাবুছড়া, দিঘীনালা)। জমির পরিমাণ ২৯.৮১ একর। উচ্ছেদ ২১ পরিবার। [সূত্রঃ আলুটিলা ভূমি রক্ষা ছাত্র জোটের প্রকাশিত লিফলেট]

দেশের রাষ্ট্রপ্রধান-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রত্যকটা সফর যদি পাহাড়িদের উচ্ছেদ, ভূমি হারানো ও দুঃখ দুর্দশা দুর্গতির কারণ হয় এদেশ কি পাকিস্তানের থেকে কোনো অংশে কম নয়? পরাধীন দেশে এদেশের মানুষের দু:খ-দুর্দশার কারণ ছিল পাঞ্জাবিরা-পাঠান শাসকরা; আজ স্বাধীন দেশে পাহাড়িদের দু:খ-দুর্দশার কারণ কি তাহলে নব্য পাকিস্তানি বাঙালি শাসকরা?

আজো কাপ্তাই বাঁধের বিদ্যুতে যেমন পাহাড়িদের দীর্ঘশ্বাস বয়ে চলে, ঠিক স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও রাষ্ট্রীয় নেতাদের পাহাড় সফরে নিজভূমি হারানোর হাহাকার-বেদনা-ক্ষোভ বয়ে চলে।

গত ০৮ নভেম্বর, ২০২০ চিম্বুক পাহাড়ের সন্তান ম্রো’রা ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র প্লুং নিয়ে সমবেত হয়েছিলেন নিজেদের মা-মাটি রক্ষার্থে। শত শত ম্রো নারী সন্তানদের কোলে নিয়ে এসেছিলেন প্রতিবাদ জানাতে। যেন তাঁদের সন্তান এই চিম্বুক পাহাড়ের প্লুং এর সুরে সুরে নিরাপদে হেসে খেলে বেড়ে উঠতে পারে।

এই সেই প্লুং যা নিয়ে ম্রোদের মধ্যে লোকগাঁথা প্রাচীন বিশ্বাস প্রচলিত আছে। একবার এক ম্রো গ্রামে কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, তখন একজনকে স্বপ্নে দেখানো হয় যে ৭টি ছিদ্রওয়ালা এক বাঁশি বাজিয়ে গ্রাম প্রদক্ষিণ করলে কলেরা চলে যাবে। পরে সেই নির্দেশনা অনুযায়ী তৈরি করা হয় এই প্লুং বাঁশি।

আজ প্রকৃতির সহজ-সরল সন্তান ম্রো’রা প্রকৃতি-পাহাড় রক্ষার্থে প্লুং নিয়ে জড়ো হতে বাধ্য হয়েছে। তাঁরা হোটেল পর্যটন স্থাপনা বন্ধে পাঁচ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছে। রাষ্ট্র কী মো জনগোষ্ঠীর প্লুং বাঁশির করুণ সুর শুনবে?

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

এই সময়ে এম এন লারমা: যিনি মৃত্যুর পরও নিপীড়িত জনগণের মুক্তির দিশারী;

  এই সময়ে এম এন লারমা: যিনি মৃত্যুর পরও নিপীড়িত জনগণের মুক্তির দিশারী; ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০     পোট্রেটঃ পাপিয়া চাকমা,জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী;     [গত ১৫ সেপ্টেম্বর এন লারমার ৮১ তম জন্মদিবস ছিল।১৯৩৯ সালের তিনি রাঙামাটির “মাওরুম“ নামে ছোট্ট নদীর/ছড়ার তীরে মাওরুম গ্রামে জন্মেছিলেন। এম এন লারমা কারো কাছে পরিচিত ‘লিডার’,তাঁর ভাই বোনের কাছে পরিচিত মঞ্জু নামে,জুম্ম জনগণের প্রায় সকলের কাছে তিনি অবিসংবাদিত নেতা,পার্টির নামে তিনি পরিচিত “প্রবাহণ “।তাঁর পুরো নাম মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা।মহান এই নেতাকে  জানাই লাল সালাম।গত কয়েকদিন আগে তাঁকে নিয়ে অনেকে লিখেছেন,,বলেছেন,আবেগাক্রান্ত হয়েছেন,শ্রদ্ধায় মাথা নত করেছেন এবং কেউ কেউ  বিরুদ্ধাচারণও করেছেন।আমি মনে করি ,এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এম এন লারমার কর্ম,সাধনা,চিন্তার যথার্থ মূল্যায়ন হওয়া দরকার। নিপীড়িত জুম্ম জনগণ এবং ব্যাক্তি এম এন লারমার লড়াইকে একই সূতায় গাঁথা দরকার।এবং পার্বত্য চুক্তি উত্তর প্রজন্মে জুম্ম জনগণের লড়াইকে এগিয়ে নিতে সঠিকভাবে এম এন লারমাকে   উপস্থাপনও এই স...

দেশবিভাগ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম

      ছবি:ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত;”পার্বত্য চট্টগ্রাম”অংশটি স্পষ্ট করার জন্য কিছুটা এডিট করেছেন                                      চবি চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী সুইন চাকমা।                                                     দেশবিভাগ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম  শুরুর কথা,১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে “ভারত স্বাধীনতা আইন- ১৯৪৭“ পাশ হয়। এই আইন পাশ ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের অবসান নিশ্চিত করে ।এক মাস পরে ভারত দুভাগ হয়ে যায় ।দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটো রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে ।ভারতের অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী   এবং গুরুত্বপূর্ণ দুটো   প্রদেশ – বাংলা ও পাঞ্জাবকে পূর্ব-পশ্চিম অংশে ভাগ করা হয় ।ব্রিটিশ সরকার স্বীকৃত স্বশাসিত রাজ্য পার্বত্য চট্টগ্রামকে সম্পূর্ণ   অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে পাকিস্তানে অর্ন্তভুক্...

মহালছড়িতে সেনা-সেটলার হামলার ১৭ বছর : হয়নি এখনো বিচার

                 ছবি:ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত আজ মহালছড়িতে সেনা-সেটেলার হামলার ১৭ বছর।২০০৩ সালরে ২৬ আগস্ট মহালছড়ি উপজেলায় সেনাবাহিনী-সেটেলার বাঙালি যৌথভাবে জুম্মদরে উপর এ হামলা চালায়।নৃশংস এ হামলার ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও সরকার হামলার সাথে জড়িত সেনা-সেটলারদের আজো বিচার করেনি। মহালছড়ির জুম্ম অধ্যুষিত ৫ টি মৌজার ১৪ টি গ্রামের ৩৫০টি ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়।এতে ২ জন জুম্ম(এক শিশু) নিহত,প্রায় শতাধিক আহত এবং ১০ জন জুম্ম নারীকে র্ধষণ করা হয়।এক হিসাবে,জুম্মদের প্রায় ৩০ লাখ টাকার সম্পত্তি,মালামাল লু›ঠন ও ধ্বংস করা হয়। হামলায় যাঁ রা নেতৃত্ব দেনঃ ০১.মহালছড়ি জোনের ২১ ইবিআর সদস্যরা; ০২.মি.আবুল কালাম আজাদ; ০৩.জহিরুল ইসলাম; ০৪.নুরুল ইসলাম; ০৫.মো.আব্দুর রশিদ; ০৬.মো.জামাল উদ্দীন; ০৭.অজিত কান্তি দাশ; ০৮.রতন কুমার শীল; ০৯.জসিম উদ্দীন; ১০.ডা.প্রদীপ কুমার চৌধুরী; ১১.তাপস বড়ুৃয়াসহ অনেকে.. যাঁরা হামলায় প্রত্যক্ষ মদদ দেয় - ১.মি.ওয়াদুদ ভূইয়া,২৯৮ নং আসনের সংসদ সদস্য,বিএনপি নেতা,সেটেলারদের সর্দার; ২.মি.হুমায়ন কবির খান,জেলা প্রশাসক,খাগড়াছড়ি; ৩.মি.মতিউর রহমান শেখ,পুলিশ সুপার,খাগড়াছড়...